মনের কথা মনে থাকে কি?

জীবন চলার পথে মানুষের কত কিছুইতো মনে থাকে না। ছাত্রের পড়া মনে থাকে না, ব্যবসায়ীর হিসাব মনে থাকে না, শ্রমিকের কাজ মনে থাকে না, কারো ‘মন’- এর কথাই মনে থাকে না। জীবনের গতিপথে মানুষ নানা বিষয়ের সাথে জড়িত। মানুষের যত বিষয় তত হিসাব। কথার হিসাব, ব্যথার হিসাব, জানার হিসাব, মানার হিসাব। এই সকল হিসাব যে মনে রাখে তার নাম ‘মন’। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই মনের কথা আপনার আমার মনে থাকেতো? চলতে চলতে আমরা কত পথেই না চলি, বলতে বলতে আমরা কত কথাই না বলি। কিন্তু সচেতন মন আমাকে কতটুকু চলতে কিংবা বলতে সাহায্য করে সেটার হিসাব কী কখনো আমরা মনের কাছ থেকে নিয়েছি। নাকি অবচেতন মনই আমাকে আপনাকে কত পথে চালিয়েছে কত কথা বলিয়েছে।

বুদ্ধি ও বিবেকবোধের এক সমষ্টিগত রূপ মন। চিন্তা, অনুভূতি, আবেগ, ইচ্ছা এবং কল্পনার মাধ্যমে এর প্রকাশ ঘটে। মন কী এবং কিভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে অনেক রকম তত্ত্ব প্রচলিত আছে। জড়বাদী দার্শনিকরা মনে করেন, মানুষের মনের প্রবৃত্তির কোনো কিছুই শরীর থেকে ভিন্ন নয়। বরং মানুষের মস্তিষ্ক থেকে উদ্ভূত শরীরবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মন গড়ে ওঠে। আর বিশ্বাসী মানুষেরা মনকে আত্মা হিসেবে অভিহিত করেন। প্রতিটি মানুষের ভেতরে থাকা মন বা আত্মাই হলো মানুষের নিয়ন্ত্রক। ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রক সেই ‘মন’-এর খবর যদি ব্যক্তির কাছে না থাকে তাহলে ব্যক্তির প্রকৃত অস্তিত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে; হারিয়ে ফেলে তার জন্মের সার্থকতা।

মানুষের মন যতক্ষণ তার নিয়ন্ত্রণে থাকে, মানুষ যতক্ষণ মনের কথা মনে রাখতে পারে, ততক্ষণ মানুষের অধীনেই তার মন ন্যস্ত থাকে। মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সে মন অবচেতন হয়ে যায়। ফলে সে মন আর তার অধীনে থাকে না। সে ভাবনার রাজ্যে ঘুরে বেড়ায়। মানুষ যখন অবচেতন মনে পড়ে থাকে তখনো কিন্তু তার মন কাজ করে। অবচেতন মনকে কোন না কোন দিক থেকে ঘুরিয়ে আনে। মানুষের মনের শক্তি এমনই। এটি বসে থাকে না। অবিরাম চলতে থাকা এই মনকে মানুষ যখন কাজ না দেয়, অলস বানিয়ে রাখার চেষ্টা করে তখন সেখানে অকল্যাণ ভর করে। মূল্যবান একটি বিখ্যাত বাণী রয়েছে, Empty mind is devil’s workshop.‍ অর্থাৎ “অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।” মনকে অলস বানিয়ে রাখবেন তো শয়তান তাকে তার অপকর্মের কারখানা বানিয়ে ফেলবে। তাই সর্বদা চেতন মনকে কল্যাণ চিন্তায় নিবেদিত না করতে পারলে সেটাকে অন্যায় ও অকল্যাণ গ্রাস করে নেবে।

‘মন’-এর কথা আসলে মনে থাকে কি না? কিংবা মন কোথায় থাকে? এ ব্যাপারে চমৎকার একটি উদাহরণ দিয়েছেন মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম তারই লেখা “মনটাকে কাজ দিন” বইয়ের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ২৬ সেল নামক ১২ কামরাবিশিষ্ট দীর্ঘ দালানের এক নম্বর কামরায় আমার ১৬ মাসের জেলজীবন কাটাই। দিনের বেলা আমার কামরার সামনে নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে একজন সিপাই সব সময় ডিউটিরত থাকত। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পালাক্রমে দু’জন সিপাই ৬ ঘণ্টা করে অবস্থান করত। রাতে প্রত্যেকের ৩ ঘণ্টা করে ডিউটি করতে হতো। দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা সময় তাদের যেভাবে কাটত তা দেখে আমার মায়াই লাগত। কখনো একটু পায়চারি করে, কোন সময় বারান্দার লোহার সিক ধরে দাঁড়িয়ে, এক সময় দেয়ালে হেলান দিয়ে, মাঝে মাঝে বসে একটু ঝিমিয়ে কোন রকম সময়টা পার করতে হতো। ২৬ সেলের চাবির ছড়া হাতে ডিউটিরত অপর একজন সিপাইর সাথে গেটের সিঁড়িতে বসে আলাপ করা কালে তার সময়টা ভালোই কাটত বলে মনে হয়। আমি আলাপ করলে খুব খুশি হতো। ঐ এলাকার জমাদার এ দু’জন সিপাইর সাথে গল্পরত অবস্থায় দেখলে আমি কয়েকজনকে একসাথে পেয়ে জিজ্ঞেস করতাম, আপনারা ডিউটিতে থাকাকালে শরীরটাতো দাঁড়িয়ে, বসে বা হেঁটে সময় কাটান, কিন্তু মনটা এ সময় কোথায় থাকে এবং কী করে? প্রশ্ন শুনে একে অপরের দিকে চেয়ে মুচকি হেসে আমার দিকে অসহায় চোখে তাকালে আবার ঐ প্রশ্নই করতাম। তখন একটু ভেবে পাল্টা প্রশ্ন করত, মনে হাজারো চিন্তা ভাবনা তোলপাড় করতে থাকে- পারিবারিক বিষয়, চাকরিতে সমস্যা, অভাব অনটন নিয়ে দুশ্চিন্তা, আজেবাজে কত কথা যে মনে জাগে এর কি কোনো হিসাব থাকে? আবার প্রশ্ন করতাম, আচ্ছা, এসব ভাবনা-চিন্তা কি নিজে নিজেই এসে ভিড় জমায়, না সচেতনভাবে একটা একটা করে বিষয় নিয়ে ভাবেন? একটু হেসে জওয়াব দিত, এর কোন ঠিকানা নেই। কখন যে কোন কথা মনে হাজির হয়ে যায় তা টেরও পাওয়া যায় না।

সত্যিকারভাবে মানুষের মনের অবস্থা এমনই। কখন যে মনে কোন কথা হাজির হয়ে যায়, কোন চিন্তা আশ্রয় নেয় তা আসলে টেরই পাওয়া যায় না। ‘মন’-এর ব্যাপারে একটা প্রচলিত কথা আছে, ‘মানুষের মন আকাশের রঙের ন্যায়’। এ কথাটির একটি তাৎপর্যও আছে। কারণ আকাশের রঙের যেমন কোনো স্থায়িত্ব নেই, কখন কোন অবস্থা ধারণ করে বলা যায় না। তেমনি মানুষের মনও নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পারলে একই বিষয়ের ওপর তার স্থায়িত্ব থাকে না। মন বড়ই বিচিত্র। মনের অবস্থা কখন যে কী রূপ ধারণ করবে তা বলা যায় না। মনের যিনি ধারক তথা ব্যক্তি, তিনিও অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না মনের ওপর। রক্ত-মাংসের বিশাল দেহের মানুষটি নিয়ন্ত্রিত হয় অদৃশ্য সেই মনের দ্বারা। মন বলছে তো গোটা দেহ সেদিকে ধাবিত হচ্ছে। মন বলেনি তো কোনোভাবেই নড়ছে না বিশাল দেহটি। অনুভবযোগ্য না হওয়ার পরও অদৃশ্য মনের প্রভাব অনেক বেশি। মনই হলো সব ক্রিয়ার নিয়ন্ত্রক। মনকে মনে না রেখে তাকে উপেক্ষা করে চলার কোনো উপায় নেই। যে কাজে মন সায় দেবে না সেখানে কোনো প্রাণ থাকবে না। মন+যোগ হলেই কাজে প্রাণ আসে, গতি পায়।

আপনার আমার ফেলে আসা কিছু মুহূর্তের কথা চিন্তা করুন তো। সামান্য এই জীবনের পথচলায় মন কত শত বার কত দিকে চলে গেছে, কত শত বার আবার মনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার চেষ্টা হয়েছে তার কি কোন হিসাব আছে? মন এই আমার নিয়ন্ত্রণে আছে আবার মুহূর্তেই আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে কত চিন্তা, দুশ্চিন্তাকে আশ্রয় দিয়েছে। আসলে মনের শক্তি এমনই। এ জন্য মনকে বলা হয় একটি শক্তিশালী যন্ত্র! এর যোগ্যতা, কর্মক্ষমতা এবং ব্যাপ্তি অনেক বেশি। এ জন্য কাজ ছাড়া সে এক মুহূর্তও থাকতে পারে না।
মানুষের মন দুই অবস্থায় থাকে- এক. সচেতন, দুই. অবচেতন। সচেতন মনের যে রকম কার্জ ক্ষমতা আছে অবচেতন মনেরও তেমন কর্মক্ষমতা আছে। পার্থক্য হলো সচেতন মন গ্রহণ কিংবা বর্জন করতে পারে। আর অন্য দিকে অবচেতন মন কেবলমাত্র গ্রহণ করতে পারে বর্জন করতে সক্ষম নয়। অবচেতন মন যা গ্রহণ করে তার ভালো-মন্দ বাছবিচার করে না। মন যেহেতু সচেতন কিংবা অবচেতন দুই অবস্থায়ই কাজ করে সেহেতু আমাদের মন নিষ্কর্মা হয়ে থাকতে পারে না। তাই মনকে সব সময় কল্যাণমূলক কাজে ব্যস্ত রাখা উচিত। না হলে নেতিবাচক কাজ মনের ভেতর প্রবেশ করে জীবনটাকেই সর্বনাশ করে দিতে পারে।
“আল্লাহ মানুষকে যে চিন্তাশক্তি দিয়েছেন সে আলোকে যা করে তাই মন।” মনের বৈশিষ্ট্য হলো সে কাজ ছাড়া থাকে না, সে থাকে সদাব্যস্ত। মানুষ কাজ করতে করতে একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়, শ্রান্ত হয়, বিশ্রামের প্রয়োজন হয়, কিন্তু মন ক্লান্ত হয় না, শ্রান্ত হয় না, কিংবা বিশ্রামের প্রয়োজন হয় না। এমনকি মানুষের দেহ যখন ঘুমায় মন তখনও ঘুমায় না। মন তখনও থাকে সদা জাগ্রত। ঘুমের সময়ও কিন্তু মন স্বপ্ন দেখে। মানুষ যখন বিছানায় গা এলিয়ে দেয় মন তখনও কাজ করতে থাকে। বরং মনের কাজ তখন বেড়ে যায়। শরীর বা দেহ কাজ না করলেও তার ইন্দ্রিয়শক্তি চিন্তাশক্তি কাজ করে।

‘মন’-এর কথা মনে রাখার প্রশ্ন কেন আসে? সত্যিকার অর্থে মনের কথা মনে রাখার প্রশ্ন এ জন্যই আসে যে, কারণ মন কাজ ছাড়া থাকতে পারে না। এখন আমি যদি মনের খবর না রাখি। মন কি কাজ করছে তার হিসাব না নেই। সচেতনভাবে মনটাকে কাজ না দিই তখন আর কেউ তাকে কাজ দেবে, তখন সে জায়গায় শয়তান আশ্রয় নেবে। শয়তান বা ইবলিসের কাজই হলো মনটাকে কাজ দিয়ে আটকিয়ে রাখা। শয়তান হলো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। মানুষ সৃষ্টির পর প্রথম মানব হযরত আদম (আ)কে সেজদা করতে বলার পর শয়তান অহঙ্কার প্রদর্শন করে সিজদা থেকে বিরত থাকে। তখন আল্লাহ তাকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করেন। পাশাপাশি মানুষকে বিভ্রান্ত করার ক্ষমতাও দেয়া হয়। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে এ প্রসঙ্গে এসেছে, সে বলল- “আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, সে কারণে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আপনার সরল পথে বসে থাকব। তারপর অবশ্যই তাদের নিকট উপস্থিত হবো, তাদের সামনে থেকে ও তাদের পেছন থেকে এবং তাদের ডান দিক থেকে ও তাদের বাম দিক থেকে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।” (সূরা আরাফ : ১৬-১৭) শয়তানের এ অপতৎপরতা সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, মানুষ এমন এক ঘোড়া যার পিঠ কখনো খালি থাকে না। যদি সে সবসময় আল্লাহকে তার পিঠে সওয়ার করিয়ে রাখে তাহলে সে নিরাপদ। যখনই তার পিঠ খালি হয় তখনই ইবলিস চেপে বসে। সুতরাং মনের খবর যদি আমরা না রাখি তাহলে শয়তানের দখলে চলে যাবে মন। কাজও হবে তার ইচ্ছায়।

কাজের সূচনা হয় মন থেকে। কাজ হলো মানুষের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। আর এই সূচনা তথা ইচ্ছাটা আসে মন থেকেই। এখন এই ইচ্ছাটা যদি ভালো হয় কাজও হয় ভালো, আর ইচ্ছা তথা ভাবনা যদি খারাপ হয় কাজও হয় খারাপ। মানুষ যদি তার মনকে মন্দ চিন্তা দেয়, তথা মন থেকে যদি মন্দ চিন্তার উদ্রেক হয় তবে তার কাজগুলোও হবে সেই রকমই অর্থাৎ মন্দ কাজ। আমরা যদি মন্দ কাজ থেকে বাঁচতে চাই তাহলে আমাদের মনকে কাজ বা চিন্তা দিতে হবে। আর কর্মজীবনে গিয়ে ভালো কাজের চর্চা করতে হলে এখন থেকেই মনকে ভালো কাজ দিয়ে ব্যস্ত রাখতে হবে।

ব্যক্তি যত বড়ই হোক না কেন শয়তান তাকে ধোঁকা দেবেই। হোক সে বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, রাষ্ট্রনায়ক, বা সফল কোন ব্যক্তি। কোন না কোন ফাঁকে শয়তান তাকে বা তার মনটাকে মন্দ কাজ দিতে চেষ্টা করবেই। যিনি কুরআন পড়েন, হাদিস পড়েন এবং সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করেন তিনিও যদি মনের খবর না রাখেন তাহলে শয়তান যেকোনো সময় তার ওপরও ভর করতে পারে। এ জন্য আমরা দেখি মাঝে মধ্যে ভালো কিছু মানুষও গোমরাহির পথে পা বাড়ান। এটি শয়তানেরই কারসাজি। মনের ওপর তার প্রাধান্য বিস্তার করে বলেই এমনটি সম্ভব হয়।

মনটাকে কিভাবে ভালোভাবে রাখা যায় সে চেষ্টায় আমাদের নিবেদিত হতে হবে। মনের খোঁজ রাখতে হবে। মনকে রাখতে হবে নিজের নিয়ন্ত্রণে। কারণ সকল মন্দ কাজ থেকে মনকে বিরত রাখা এটি আমাদের জীবনের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জের উত্তরণ করতে না পারলে জীবনের উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে যাবে।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.