‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট’

সাফল্যের অভীষ্টে ছুটে চলা মানুষের সঙ্গী একটি চমৎকার স্বপ্ন। যে চমৎকার স্বপ্নটিকে ধারণ করেই মানুষ সাফল্যের মঞ্জিলে পৌঁছতে চায়। তবে শুধুমাত্র একটি সুন্দর স্বপ্নকে লালন করেই সাফল্যের কাঙ্ক্ষিত মঞ্জিলে পৌঁছা যায় না। যে বিষয়ে স্বপ্নের জাল বোনা হয় সে বিষয়ে একটি লক্ষ্য ঠিক করে নিয়ে তবেই সামনে এগোতে হয়। লক্ষ্যহীন ছুটে চলায় কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জিত হয় না। লক্ষ্য যদি ঠিক না হয়, সুনির্দিষ্ট করা না হয় তাহলে এ ছুটে চলা হবে কূলহারা তরীর মত। কূলহারা তরী যেমন নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ছাড়াই ভাসতে থাকে, সময় যায় দিন যায় কিন্তু তীরের সন্ধান পায় না, নির্দিষ্ট কোনো সীমানায় ভিড়তে পারে না। তেমনি লক্ষ্যহীন ব্যক্তিও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকায় গন্তব্যহীন কূলহারা তরীর মত লক্ষ্যহীন গন্তব্যে ছুটতে থাকেন। ফলে তিনি শুধু পথ চলতেই থাকেন। দিন ফুরিয়ে যায়, সময় ফুরিয়ে যায় তবু তার গন্তব্য শেষ হয় না।

যাদের কোনো লক্ষ্য নেই তারা কখনো অভীষ্টে পৌঁছতে পারেন না। যারা সাফল্য চান, সফল হতে চান তারা দৃষ্টিকে নিবদ্ধ রাখেন লক্ষ্যের দিকে। জীবনে সফলতার পথে অগ্রসর হতে তারা লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে সে দিকে মনোসংযোগ করেন। সাফল্য লাভের জন্য লক্ষ্যকে এমন উঁচুতে তারা নিবদ্ধ করেন যাতে সাফল্য লাভের ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়। সেই সম্ভাবনা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে গতি সঞ্চার করে। ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করে দেহ ও মনে। পরিশ্রমকে সার্থক করে তোলে।

মানুষের জীবন চলার পথ কখনো কিন্তু সহজ সরল হয় না। চলার পথে অনেক বাঁক থাকে। প্রতিটি বাঁকে মানুষকে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। আর এটাই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জীবনের এই পথচলায় প্রতিবন্ধকতা, প্রতিকূলতা, ঝড়ঝঞ্ঝা মাড়িয়ে মানুষকে মঞ্জিলে পৌঁছাতে হয়। চলার শুরুতেই যদি প্রত্যেক ব্যক্তি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে এগোতে পারেন তাহলে শত প্রতিবন্ধকতা, প্রতিকূলতা ঝড়ঝঞ্ঝা মাড়িয়ে তিনি সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারেন। ‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট’ তবে সাফল্য সুনিশ্চিত।
একটি সুন্দর স্বপ্নের বাস্তব রূপ তথা সাফল্য লাভের জন্য একটি কর্মপ্রচেষ্টাসমৃদ্ধ লক্ষ্য থাকা দরকার। কারণ অনেক সময় দক্ষতা থাকলেও লক্ষ্য স্থির না থাকায় কাজে সাফল্য আসে না। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকলে পথের নিশানা যেমন পাওয়া যায় না তেমনি কাজেও পাওয়া যায় না সফলতা। আর নিশানা যখন সহজ হয় তখন লক্ষ্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও থাকে উজ্জ্বল। এ জন্য সাফল্যের ছোঁয়া পেতে লক্ষ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। যারা লক্ষ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হবেন তারা সাফল্য অর্জনেও হবেন ব্যর্থ।

লক্ষ্যের গুরুত্ব যখন এত বেশি তখন আমাদের সমাজে দেখা যায় কিছু মানুষ লক্ষ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন না। এর পেছনে কারণও রয়েছে। কেউ লক্ষ্যের গুরুত্ব বুঝেন না, কিংবা কারো এ সংক্রান্ত শিক্ষা নেই। আবার কেউ জানার পরও কাক্সিক্ষত সাফল্য পাবেন কি না এই সন্দেহে লক্ষ্য নির্ধারণ করেন না। কারো আত্মবিশ্বাসের অভাব কিংবা কারো সমস্যা সীমাবদ্ধ-চিন্তা। কিন্তু সকলকেই স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে লক্ষ্য হচ্ছে ধাপে ধাপে উন্নীত হওয়ার নির্দিষ্ট একটি পদ্ধতির নাম। আর লক্ষ্য স্থির করা মানে হচ্ছে একের পর এক অর্জিত হওয়া কয়েকটি পদ্ধতির সমষ্টি। এ কথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে সাফল্য লাভের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকতে হবে। তবে এ লক্ষ্যে পৌঁছতে প্রতিদিন কিছু না কিছু কাজ করে প্রাথমিকভাবে প্রতিনিয়ত অভীষ্ট লক্ষ্যে অগ্রসর হতে হবে। তাই প্রতিদিনের জন্যও আলাদা করে কিছু লক্ষ্য স্থির করতে হবে যা অর্জনের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকেই দ্রুত এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। যেমন একজন ছাত্র কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় জিপিএ ৫ অর্জনের লক্ষ্য স্থির করলো। এখানে জিপিএ ৫ পাওয়াটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য। কিন্তু এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে অর্থাৎ জিপিএ ৫ পেতে তাকে কিছু পদ্ধতি গ্রহণ করে সামনে এগোতে হবে। প্রতিদিন কত ঘণ্টা পড়ালেখা করলে সে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে এটি তাকে ঠিক করতে হবে। পাশাপাশি তাকে সিলেবাস প্রণয়ন, অগ্রাধিকার পাঠও নির্ধারণ করতে হবে। প্রতিদিন কতটুকু অভীষ্টে এগোনো সম্ভব হলো তার হিসাবও করতে হবে। আগামীকাল কতটুকু লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে তাও ঠিক করতে হবে।

লক্ষ্যের সাথে নিয়তের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। কারণ যাবতীয় কাজের ফলাফল নিয়তের ওপরেই নির্ভর করে। নিয়তের আরেকটি পরিপূরক নামই হলো লক্ষ্য স্থির। কেউ যদি বলে আমি অমুক কাজ করার নিয়ত করলাম। তার মানে তিনি কোনো একটি কাজ করার লক্ষ্য স্থির করলেন। মানুষ কী জন্য সাফল্য অর্জন করতে চায় তার উদ্দেশ্য ঠিক করতে হবে। কারণ কাজের বিশুদ্ধতা নিয়তের শুদ্ধতার ওপর নির্ভর করে। তাই লক্ষ্য স্থির করতে নিয়তের বিশুদ্ধতা প্রয়োজন। মানবতার মহান শিক্ষক রাসূলে কারীম (সা) কাজের শুরুতে নিয়তের তথা লক্ষ্য স্থির করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। হযরত ওমর (রা) থেকে বর্ণিত একটি প্রসিদ্ধ হাদিস রয়েছে। তিনি বলেন, রাসূল (সা) ইরশাদ করেছেন- যাবতীয় কাজের ফলাফল নিয়তের ওপরেই নির্ভর করে। প্রতিটি লোক তাই পাবে যা সে নিয়ত করেছে। (বোখারী ও মুসলিম)

লক্ষ্য স্থির জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যারা সফলতার ছোঁয়া পেতে চান তাদের জন্য কাজের শুরুতে লক্ষ্য নির্ধারণ করা অবশ্যক। কারণ লক্ষ্য নির্ধারণ না করে যদি কাজ শুরু করে দেয়া হয় তাহলে তাতে সাফল্য জোটার সম্ভাবনা থাকে খুবই ক্ষীণ। একজন নৌকার মাঝি সারাদিন নৌকা বাইতে থাকলেন কিন্তু তিনি লক্ষ্য স্থির করলেন না কোন ঘাটে ভিড়বেন তাহলে তার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে বাধ্য। তার সারাদিনের নৌকায় বৈঠা চালানো পন্ডশ্রম ছাড়া আর কিছু নয়।

অনেকেই বড় সাফল্য অর্জনের জন্য লক্ষ্য স্থির করতে সাহস করেন না। ছোট ছোট সাফল্যের পেছনেই ছোটাছুটি করেন। কিন্তু লক্ষ্য যদি স্থির করা যায় তাহলে যেকোনো বড় সাফল্যও ধরা দিতে বাধ্য। রাসূল (সা) যখন পারস্যকে মুসলমানদের পদানত করার লক্ষ্য স্থির করেছিলেন তখন পারস্য সা¤্রাজ্য ছিল বিশ্বব্যাপী এক অপরাজেয় শক্তি, আর মুসলমানদের হিসাব করার মতো কোনো শক্তিই ছিল না। তারপরও রাসূল (সা) লক্ষ্য স্থির করেছিলেন পারস্যকে মুসলমানদের পদানত করার। লক্ষ্য স্থির করে দীপ্ত সাহস ও পরিশ্রমের ফলে একদিন সত্যিই পারস্য সাম্রাজ্য মুসলমানদের পদানত হয়েছিল। বিশ্ববিজয়ী বীর জুলিয়াস সিজার বলেছিলেন, ‘অধিকাংশ মানুষ বড় হতে পারে না কারণ সে সাহস করে আকাশের মতো সূর্যে লক্ষ্য স্থির করে সেদিকে তাকাতে পারে না বলে।’ লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য যদি না থাকে তাহলে অর্জন শূন্য হতে বাধ্য। সাফল্যের পেছনে ছুটতে হলে আপনাকে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করতে হবে। কেননা আপনার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যই আপনাকে সাফল্যের পথে পরিচালনা করবে।

তবে লক্ষ্যের মাত্রা এবং উচ্চতার মধ্যে ভারসাম্য থাকা উচিত। ব্যক্তি তার লক্ষ্যকে এমন উচ্চতায় নিবদ্ধ করা উচিত যাতে লক্ষ্য অর্জনে নিজের ভেতর থেকেই স্পৃহা জাগ্রত হয়। অনেকেই লক্ষ্য স্থির করতে গিয়েই খেই হারিয়ে ফেলেন। লক্ষ্য স্থির করার আগেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারা না পারার দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে থাকেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য লক্ষ্যের মানদন্ড যাচাই করে নেয়া উচিত। তবে এ কথা মনে রাখতে হবে, সাফল্য লাভের জন্য জীবনের সব লক্ষ্য পরস্পরের সাথে সামঞ্জস্য হওয়া উচিত। নিজের সুন্দর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সুনির্দিষ্ট কর্মতৎপরতার মাধ্যমে লক্ষ্য স্থির রেখে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত। অর্থহীন লক্ষ্য এবং জাতীয় জীবনের সাথে মূল্যবোধহীন লক্ষ্য স্থির ব্যক্তির সফলতার উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। যত তাড়াতাড়ি জীবনের লক্ষ্য স্থির করা যায় ততই তাতে সফলতা নিহিত রয়েছে। কারণ জীবনের লক্ষ্য স্থির থাকলে তাতে সাফল্য অর্জনের আবেগও থাকবে। আরো লক্ষ্য স্থির করুন তখন দেখবেন আপনার লক্ষ্য পানে এগিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য আবেগ এবং উচ্ছ্বাস যোগ হয়েছে। এর সাথে শুধু অধ্যবসায় যোগ করে দিতে পারলেই সফলতা অর্জন সম্ভব।

পরিশেষে গানের সুরের সাথে মিলিয়ে বলতে হয়, ‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট, বিশ্বাস হৃদয়ে, হবেই হবেই দেখা, দেখা হবে বিজয়ে’। হ্যাঁ, সত্যিই লক্ষ্য স্থির করে যদি আপনি ছুটতে পারেন, তাহলে বিজয় তথা সাফল্যের দেখা আপনি অবশ্যই পাবেন।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.