সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণে আন্তরিক হোন

মানুষ সামাজিক জীব। সামাজিক জীব হিসেবেই প্রতিনিয়ত তাকে সমাজের অন্যান্য মানুষের সাথে চলতে ফিরতে হয়, কথা বলতে হয়। এটি মানুষের জীবনাচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। গুরুত্বপূর্ণ এ অধ্যায়ে শুধুমাত্র আচরণের কারণেই একজন আরেকজনের বন্ধু হয়, একজন আরেকজনের শত্রু হয়, একজন আরেকজনকে কাছে টেনে নেয়, একজন আরেকজনকে দূরে ঠেলে দেয়। আচরণের এই ভিন্নতার কারণেই মানুষের পরিচয়ও ভিন্নভাবে ফুটে ওঠে। ফুটে ওঠে মানুষের রুচিবোধের বৈশিষ্ট্য। মানুষ যা করে তা করতে গিয়ে যদি ভদ্র, মার্জিত ও সুন্দর আচরণের আশ্রয় নেয় তবে তাতেই বিকশিত হয় তার রুচিবোধ। কারণ, মানুষের আচরণই তার অন্তরের অনুভূতির প্রকাশ, মানুষের মধ্যে কে ভালো, কে মন্দ তা নির্ভর করে তার অন্তরের অনুভূতি থেকে প্রকাশিতব্য আচরণের ওপর।

আমার আর আপনার মূল পরিচয় শুধুমাত্র বাহ্যিক আচরণে ফুটে ওঠে না, এটা হয়তো সাময়িক কোনো খ্যাতি দিতে পারে। কিন্তু আমার আপনার ভেতরকার মানুষটির প্রকৃত আচরণই মূল পরিচয় বহন করে। সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী মহামানব রাসূল (সা) তার বক্ষের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘আত্তাকওয়া হাহুনা’ অর্থাৎ মুত্তাকির পরিচয় এখানে (অন্তরে), তার বাহ্যিক চাল-চলন বা আচরণে নয় বরং তার  ভেতরকার বিষয় ফুটে ওঠার মাধ্যমে প্রকাশ হয়।

মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আচরণগত দিকের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে সদা হাস্যোজ্জ্বল থাকার মাধ্যমে। যিনি সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণে আন্তরিক হতে পারেন তিনিই সবার হৃদয় জয় করতে পারেন, সবাইকে কাছে টানতে পারেন। আচরণের সাথে সদা হাস্যোজ্জ্বল থাকার ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে। একজন দায়িত্বশীল মানুষ তার অধীনস্থদের কাছে টানার ক্ষেত্রে কতটুকু সফল হবেন তা নির্ভর করবে তার সদা হাস্যোজ্জ্বল আচরণের ওপর। সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে যদি আচরণে আন্তরিক হওয়া যায় তাহলে সবার সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়া সম্ভব এবং সবাইকে কাছে টানাও সম্ভব। যিনি সবাইকে কাছে টানতে পারেন তিনি সহজেই সবার প্রিয়ভাজন হতে পারেন।

মানুষ স্বীয় চরিত্রে পরস্পরকে আপন করে নেয়। সদগুণাবলি অলঙ্কারস্বরূপ। নিজের মাঝে লুকিয়ে থাকা সদগুণাবলিগুলোকে সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেয়া উচিত। কারণ, সদালাপ, সদগুণাবলি বিকাশেই কল্যাণ নিহিত। বদগুণাবলি তথা বদঅভ্যাস বিকাশে কোনো গৌরব  নেই। কারো সাথে যখন সাক্ষাৎ হয় এবং কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি হয় তখন হাস্যোজ্জ্বল থেকে আন্তরিকভাবে কথা বলার সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়। সাক্ষাৎদাতা এবং সাক্ষাৎপ্রত্যাশী উভয়েই আন্তরিক সম্ভাষণ কামনা করেন। আন্তরিক সম্ভাষণ আর হাসিমুখে কথা বলা অন্যের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়। সাক্ষাৎকে ফলপ্রসূ করতে হলে একটি বিষয় স্মরণ রাখতে হবে, তা হলো সাক্ষাতের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হবে হাসিমুখে আন্তরিকতা বিনিময় করা।

কথার যেমন মূল্য আছে তেমনি কথার মাধ্যমে মানুষের যে আচরণ প্রকাশ পায় তার মূল্যও অনেক বেশি। কারণ যথার্থ আচরণ ছাড়া মূল্যবান কথাও অর্থহীন হয়ে যায়। একজনের সাথে সাক্ষাৎ করার সময় গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে গিয়ে যদি গুরুত্বহীন তথা মূল্যহীন ও অমূলক আচরণ করা হয় তখন গুরুত্বপূর্ণ কথাটাই বলার আর সুযোগ থাকে না। বাচালতা, মিথ্যা আর মলিনতার আশ্রয় নিয়ে কথা বলার চেয়ে চুপ থাকাই ভালো। যারা এসবের আশ্রয় নেয় তারা রাসূল (সা) এর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত হিসেবে বিবেচিত হন। এ প্রসঙ্গে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে- রাসূল (সা) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যেসব লোক বাচাল, দুর্বোধ্য ভাষায় এবং অহঙ্কারের সাথে কথা বলে তারা আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত এবং কিয়ামতের দিন তারা আমার থেকে অনেক দূরে থাকবে। (তিরমিজি)

অসহিষ্ণু হয়ে কথা বলা, প্রশ্নের উত্তর দেয়া, সামান্য কারণেই তেতে ওঠা এসবই অসুন্দর ও আন্তরিকতার বিপরীত। এগুলো সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। কারণ, এতে পারস্পরিক আস্থা ও সম্পর্কের ভিত নড়বড়ে করে দেয়। সদা হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় কথা বলতে পারাটা মার্জিত রুচির পরিচয় বহন করে। ভদ্রতার পরিবেশ বজায় রাখে। বিরুদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধে কথা কিংবা গালি শোনা মাত্রই উগ্র হয়ে ওঠা কিংবা ক্রোধ নিয়ে জবাব দেয়ার মধ্যে কোনো সফলতা নেই। সামান্য একটু অপমান কিংবা অবহেলায় উত্তপ্ত না হয়ে একটু অপেক্ষা করা, ধৈর্য ধারণ করা উচিত। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা ফুরকানের ৬ নম্বর আয়াতে বলেন, আর তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে তখন তারা বলে সালাম (তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক)।

যদি কারো সাথে বিতর্কও করতে হয় তবে তা করতে হবে উত্তম পন্থায়। কেননা মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম তারাই যারা উত্তম পন্থা অবলম্বন করে। সূরা নাহলের ১২৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন- আর লোকদের সাথে পরস্পর বিতর্ক কর উত্তম পন্থায়। তর্ক করার অর্থ হলো হেরে যাওয়া যুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া। তর্কে আসলে জেতা যায় না শুধু মনের তুষ্টি অর্জন করা যায়। এখানে জিতলেও আপনি হারবেন আর হারলে তো কথা নেই। যত তর্কে জিতবেন তত আপনার কাছ থেকে লোক দূরে সরে যাবে, দিন দিন আপনি বন্ধু হারাবেন। সূরা আনকাবুতের ৪৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন- তোমরা সুন্দর পন্থা ব্যতীত আহলে কিতাবদের সাথে বিতর্ক করো না। মুজাদ্দেদ-ই-আল ফেসানি (রহ) বলেছেন- ভালো কথা বন্ধুদের পর্যন্ত পৌঁছাতে চেষ্টা কর। বিরুদ্ধবাদীদের সাথে বিতর্কে অবতীর্ণ  হয়ো না। সূরা লোকমানের ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- আর লোকদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কথা বলো না। মানবতার মহান শিক্ষক রাসূল (সা)-এর আচরণেও ছিল বদমেজাজ আর কাঠিন্যতা পরিহার। তাইতো তিনি সবাইকে কাছে টেনে নিয়েছেন, আপন করে নিতে পেরেছেন। এ প্রসঙ্গে সূরা আলে ইমরানের ১৫৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রাসূল (সা)কে উদ্দেশ করে বলেন- আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য নরম দিল ও সুহৃদয় হয়েছেন। যদি বদমেজাজি ও কঠিন হৃদয়ের হতেন তবে লোকেরা আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যেতো।

অনেক সময় আপনার আমার অহঙ্কার আর আত্মম্ভরিতাপূর্ণ আচরণের কারণে লোকেরা দূরে সরে যায়। আপনার জ্ঞান-গরিমা, সম্মান-মর্যাদা, বুদ্ধি-বিবেক বেশি বলে নিজেকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করবেন তা হতে পারে না। বরং তা আপনাকে আরো ছোট করে তুলবে। মেধাহীন দুর্বলের সাথে রূঢ় আচরণ করবেন তা হতে পারে না বরং সেটা আপনার অর্জনকে ধ্বংস করে দেবে। আপনি বড় মানুষ বলে অন্যের সাথে ‘দেমাগ’ দেখিয়ে কথা বলবেন, নিজেকে অন্য উচ্চতায় রাখার চেষ্টা করবেন! এমন হলে আপনার কাছ থেকে সবাই দূরে সরে যাবে।

জ্ঞান-গরিমাই সবকিছু নয় বরং আচরণ দেখেই বোঝা যায় ব্যক্তিটি কতটা সম্মানিত কতটা সুন্দর মনের অধিকারী। হাদিসে এসেছে, একবার হযরত জাবির ইবনে সুলাইম (রা) রাসূল (সা)-এর কাছে উপদেশ চাইলে রাসূল (সা) বললেন- কাউকে কখনো গালিগালাজ করো না। জাবির বলেন, এরপর আমি কখনো আজাদ, গোলাম এমনকি উট, বকরিকেও গালি দেইনি। রাসূল (সা) আরো বললেন- ভালো ও নেকির কোনো কাজকে তুচ্ছজ্ঞান করো না, তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলবে, প্রতিদিনের ছোট ছোট কথা, ছোট ছোট ব্যবহার, একটুখানি সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণে ব্যক্তির মর্যাদা, মনুষ্যত্ব ও ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

যিনি তার জীবনের পথচলায় মিথ্যা কথা, নিষ্ঠুর বাক্য ও প্রতারণা থেকে মুক্ত থেকে অন্যের সাথে আচরণ করতে পারেন তার জীবনটা সত্যিই সার্থকজীবন। হাস্যোজ্জ্বল আচরণে যদি আপনি দোষশূন্য নির্মল ও মহৎ আচরণ করেন তাহলে দেখবেন দুরাচার, দুষ্ট লোকও লজ্জায় আপনার সামনে মাথানত করবে।
যখন মনে যা আসে তাই না বলে কথায়, কাজে, ব্যবহারে, শব্দ চয়নে কৌশলী হওয়া প্রয়োজন। কখন কী বলা দরকার, কতটা বলা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা আবশ্যক। কী বলতে হবে, কী না বললে ভালো হয় তাও আগেই অনুধাবন করা প্রয়োজন, এমন কথা পরিহার করা উচিত যা মানুষকে আঘাত দেয়। তিক্ত মনোভাব নিয়ে কথা বললে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ, কথা একবার বলে অপরের মনে আঘাত দিয়ে ফেললে তা আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না।

হাসিমুখে কথা বলে আন্তরিক আচরণ দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করা বর্তমান প্রেক্ষাপটে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ উত্তীর্ণ হতে পারাই সার্থকতা। সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণে আন্তরিক হওয়ার মাধ্যমে শুধুমাত্র অন্যের হৃদয় জয় করাই হয় না, শুধুমাত্র মানুষকে কাছে টানাই হয় না, বরং এটি একটি ইবাদতও বটে। এ প্রসঙ্গে হযরত আলী (রা) বলেছেন- মানুষের সাথে হাসিমুখে কথা বলাটাও একটা ইবাদত। আলী (রা) আরো বলেন- মুমিনের চেহারায় প্রস্ফুটিত থাকে একটি হাস্যোজ্জ্বল আনন্দের রেখা। দুঃখ সমাহিত থাকে তার অন্তরের গভীরে, তার আত্মা হয় প্রশস্ত। আসুন আমরা সকলেই সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণে আন্তরিক হই।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.