অভিমান, অভিযোগ নয় সহানুভূতির দৃষ্টি প্রসারিত করুন

মানুষ একা চলতে পারে না। সামাজিক জীব হিসেবে জীবন পরিচালনায় মানুষকে একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল হতে হয়। গড়ে তুলতে হয় পারস্পরিক সেতুবন্ধ। ব্যক্তিগতভাবেও সফলতার জন্য মানুষকে একে অপরের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াতে হয়। যে কোন ক্ষেত্রে বসবাসরত মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা তাদের যে কোন সাফল্য অর্জন পথে সহায়ক হয়।

ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা মানুষের একটি বিশাল শক্তি। এই শক্তি সকল বাধাকে তুচ্ছ করে সাফল্য ছিনিয়ে আনতে মানুষকে সহায়তা করে। মানুষের এই পারস্পরিক সেতুবন্ধ তথা শক্তিশালী সম্পর্কের মাঝেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে ফাটল দেখা দেয়। সম্পর্কের চিড় ধরে। ফলে মানুষ ঐক্যবদ্ধ সেতুবন্ধের পরিবর্তে পারস্পরিক কিংবা দলগত বিভেদে জড়িয়ে পড়ে। সাফল্য ছিনিয়ে আনার পরিবর্তে বিভাজন ডেকে আনে। কিছু অর্জনের পরিবর্তে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলে। সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির পরিবর্তে পরস্পরের মাঝে বিভেদ বিভাজনের দেয়াল তৈরি হয়।

সেতুবন্ধের পরিবর্তে পারস্পরিক বিভেদ বিভাজনের দেয়াল  তৈরিতে যে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তার মধ্যে অন্যতম হলো অভিমান কিংবা অভিযোগ দাঁড় করানো। পারস্পরিক কথাবার্তা, চলাফেরা, লেনদেন, আচার-আচরণ এবং আনুগত্যে যখন অভিমান কিংবা অভিযোগ একে অপরের প্রতি দাঁড় করানো শুরু হয়ে যায় তখন সেখানে সহনশীল ও সহানুভূতির পরিবেশের পরিবর্তে একটি অসহনশীল পরিবেশ তৈরি হয়। ফলে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। বিভেদ ও বিভাজনের নানা উপসর্গও নতুন নতুন করে তৈরি হয়। সম্প্রীতি ও ভালোবাসার পরিবর্তে হিংসা ও বিদ্বেষ স্থান করে নেয়। আনুগত্যপরায়ণতার পরিবর্তে আনুগত্যহীন আচরণ শুরু হয়ে যায়। গিবত বা পরনিন্দার চর্চাও শুরু হয়ে যায়। ফলে পারস্পরিক সম্পর্কের সেতুবন্ধে সামগ্রিক এক বিপর্যয় নেমে আসে।

পারস্পরিক সম্পর্কের বিপর্যয় শুরু হয় কিন্তু সামান্য ভুল দিয়ে, তুচ্ছ ঘটনা দিয়ে। মানুষ যখন কাজ করে তখন কাজের সময় মানুষের ভুল-ভ্রান্তি হতে পারে। ভুল-ভ্রান্তি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। অস্বাভাবিক হলো, কাজের সময় ঘটে যাওয়া ছোটখাটো ভুল কিংবা ভ্রান্তিগুলোকে স্বাভাবিকভাবে না নেয়া। আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন যারা তার সহকর্মী কিংবা অধস্তনের ছোটখাটো ভুলগুলোকেও একদম সহ্য করতে পারেন না। এ ধরনের মানসিকতা কখনোই কাজের পরিবেশের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। বরং অন্যের ভুল-ভ্রান্তি ও সীমাবদ্ধতাকে সহনশীল ও সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখাই কল্যাণকর। ভুলগুলোকে ক্ষমা করে সংশোধনের সুযোগ করে দেয়ার মাঝেই রয়েছে বিশাল মহত্ত্ব। এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় এবং সংশোধন করে নেয়, তার বিনিময় আল্লাহর নিকট রয়েছে।’ (সূরা শুরা : ৪০) হযরত যাবের (রা.) থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন : যখন কোন ব্যক্তি তার অপরাধের জন্য কোন মুসলমান ভাইয়ের নিকট ক্ষমা প্রার্থী হয়, যদি সে ক্ষমা না করে অথবা গ্রহণ না করে তাহলে তার অপরাধ অত্যাচারী কর আদায়কারীর মতো। (বায়হাকি)

অভিমান, অভিযোগ পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পথ তৈরি করে। হিংসা-বিদ্বেষ আর শত্রুতা বাড়ায়। সহনশীল আর সহানুভূতির দৃষ্টিই পারে এসব কিছু থেকে পরস্পরকে রক্ষা করতে। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল (সা) এবং তার সাহাবাদের মাঝে পারস্পরিক সহানুভূতির দৃষ্টান্তই শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর রাসূল (সা) এবং তার সাথীরা কাফেরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর। কিন্তু পরস্পরের প্রতি পূর্ণ অনুগ্রহশীল।’ (সূরা ফাতাহ : ৩৯) অপর একটি আয়াতে এসেছে- ‘তারা মু’মিনদের প্রতি ন¤্র ও বিনয়ী হবে এবং কাফেরদের প্রতি হবে অত্যন্ত কঠোর।’ (সূরা মায়েদা : ৫৪) আমাদের মাঝে এমন অনেকেই আছেন যারা সামান্য অভিমান কিংবা তুচ্ছ অভিযোগকে লালন করতে করতে তা হিংসা কিংবা বিদ্বেষে রূপান্তরিত করেন, যা আপন ভাইকেও সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, নবী করীম (সা) বলেছেন, তোমরা পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করো না, দেখা-সাক্ষাৎ বর্জন করো না এবং সম্পর্ক ছিন্ন করো না, আল্লাহর বান্দারা ভাই ভাই হয়ে বসবাস কর, কোন মুসলমান তার অন্য মুসলমান ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি বিচ্ছিন্ন থাকা বৈধ নয়। (বুখারি ও মুসলিম) কুরআনে এসেছে-  ‘মু’মিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। অতএব ভাইদের সম্পর্ক পুনর্গঠিত করে দাও।’ (সূরা হুজুরাত : ১০)
অভিমান, অভিযোগের পরিবর্তে মানুষ মানুষের জন্য ক্ষমা, দয়া, সহনশীল এবং সহানুভূতিশীল হবে এটি সৎপ্রবৃত্তির নান্দনিক দিক। মুসলিম চরিত্রের নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ তো এমনই হওয়া উচিত। রাসূল (সা) বলেছেন- সেই প্রকৃত মুসলিম যে নিজের জন্য যা পছন্দ করে তার ভাইয়ের জন্যও তা-ই পছন্দ করে। কেউ যেমন নিজের সাফল্যের জন্য অন্যের সহযোগিতা চাইবে তেমনি অপরের সাফল্যের জন্যও তাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিবে। কারণ ব্যক্তিগত সফলতার জন্যও একে অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন। পরস্পর সহযোগিতা না থাকলে কেউ কোন দিন সাফল্য অর্জন করতে পারে না, সমাজও লাভবান হতে পারে না। সহনশীলতা ও সহানুভূতি মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ গুণ। যিনি ভদ্র, মর্যাদাবান তিনি সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষ হবেন এটাই স্বাভাবিক। তিনি অন্যের মন জয় করতে চান তারতো সহনশীল আচরণ না করে উপায় নেই।

সহনশীলতা ও সহানুভূতি যারা দেখাতে পারে না তাদেরকে সফল ব্যক্তিত্ব কিংবা মর্যাদাবান মানুষ বলার কোনো সুযোগ নেই। আমরা যদি পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করি তাহলে সমাজ থেকে অনেক দুঃখ, অনেক কষ্ট দূর হয়ে যাবে। প্রত্যেক মুসলমান ভাই ভাই, সুতরাং প্রত্যেকের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে এটি মূল প্রতিপাদ্য হওয়া উচিত। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা) বলেছেন, মুসলমান পরস্পর ভাই, সুতরাং সে তার ভাইয়ের ওপরে কোন প্রকার জুলুমও করতে পারে না এবং তাকে অসহায় অবস্থায়ও ফেলতে পারে না। আর যে তার মুসলমান ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে, আল্লাহ তার অভাব পূরণ করবেন। অনুরূপভাবে যে কোন মুসলমানের দুঃখ দূর করে দিবে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দুঃখ দূর করে দিবেন। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের ত্রুটি গোপন করে রাখবে, আল্লাহ হাশরের দিন তার ত্রুটিও গোপন করে রাখবেন।  (বোখারি ও মুসলিম)

অপর ভাইয়ের ত্রুটি তাকেই সংস্কারের উদ্দেশ্যে ধরিয়ে না দিয়ে কিংবা গোপন না রেখে তার অগোচরে বলে বেড়ানোই গিবত। গিবত পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিকে ধ্বংস করে সামাজিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে নষ্ট করে তোলে। অভিমান, অভিযোগের জায়গা থেকেই গিবতের জন্ম নেয়। সহানুভূতির পরিবেশ নষ্ট করে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। গিবত ব্যভিচারের চাইতেও মারাত্মক। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, গিবত হলো ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা) গিবত কি করে ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক? হুজুর (সা) বললেন, কোন ব্যক্তি জেনা করার পর যখন তওবা করে আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। কিন্তু গিবতকারীকে যার গিবত করা হয়েছে সে যদি মাফ না করে আল্লাহ মাফ করবেন না। (বায়হাকি ও মেশকাত) হযরত আবু হুরাইরা (রা) হতে বর্ণিত, একদা নবী করীম (সা) বললেন, গিবত হলো তুমি তোমার মুসলমান ভাইয়ের বর্ণনা (তার অনুপস্থিতিতেই) এমনভাবে করবে যে, সে তা শুনলে অসন্তুষ্ট হবে। অতঃপর হুজুরকে (সা) প্রশ্ন করা হলো,  হে আল্লাহর নবী! আমি যা কিছু বলব তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রেও কি গিবত হবে? হুজুর (সা) জবাব দিলেন, তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে পাওয়া যায় তাহলেও সেটা গিবত হবে। আর যদি না পাওয়া যায় তাহলে তা হবে বোহতান (মুসলিম)। আর বোহতান করা মারাত্মক অপরাধ। অপর হাদিসে এসেছে একের কথা অপরের কাছে বলে বেড়ানো হচ্ছে চোগলখুরি আর রাসূল (সা) এ জঘন্য পাপটি পরিহার করার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, চোগলখোর বেহেস্তে প্রবেশ করতে পারবে না।

অভিযোগ সমালোচনা করলে এগুলো ব্যক্তির আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। তাই বলে এর অর্থ এই নয় যে, কখনো কারোর সমালোচনা করা যাবে না, কিংবা অভিযোগ করা যাবে না। বিষয়টি আসলে তা নয় বরং এহতেসাব তথা সংস্কারের উদ্দেশ্যে সমালোচনার পদ্ধতিতে পরিশুদ্ধতা করা যেতে পারে। অভিযোগ কিংবা সমালোচনা হবে সংশোধন করার দৃষ্টিভঙ্গিতে হেয় কিংবা কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে নয়। অভিযোগের পাশাপাশি ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতি ও সহনশীলতার দৃষ্টিও রাখতে হবে। জনসম্মুখে অভিযোগ না দিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে উপস্থাপন করতে হবে। ভালো কাজের প্রশংসা করে সমাধানের পথ খুঁজে পেতে নিজ থেকেই যথাযথ সহযোগিতার হাত আন্তরিকভাবে বাড়িয়ে দিতে হবে। কিছু লোক আছে যাদের স্বভাবই হলো শুধুই অভিযোগ করা, প্রতিটি দিনকেই তারা সমস্যাগ্রস্ত দেখেন, প্রতিটি মানুষকেই তারা কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান। অথচ অভিযোগের ভালো পদ্ধতি হচ্ছে অভিযুক্তকে সংশোধন করার নিয়্যাতে সুযোগ দেয়া, নিজের আন্তরিকার প্রকাশ ঘটানো। ইমাম রাযী বলেছেন- ক্ষমা করে দেয়াটাই সর্বোত্তম প্রতিশোধ। আসুন আমরা অভিমান অভিযোগের পরিবর্তে একে অপরের প্রতি সহানুভূতির দৃষ্টি প্রসারিত করি। কারণ বোকা ও দুর্বলরাই অভিমান এবং অভিযোগ করে, এক্ষেত্রে বুদ্ধিমান হওয়াই শ্রেয়।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.